১৪ মে, চট্টগ্রাম :: চট্টগ্রামে ১৮ দলীয় জোটের মিছিল-সমাবেশকে কেন্দ্র করে গতকাল রোববার পুরো নগরীতে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে। পুলিশের সঙ্গে জোটের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে আহত হয়েছেন সাংবাদিকসহ অন্তত ১০০ জন। রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বিএনপি কার্যালয়সহ তার আশপাশ এলাকা। বিক্ষুব্ধকারীরা রাস্তায় অন্তত ১০টি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় ও ভাঙচুর করে। নগরীর সব ক’টি রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ এই ঘটনায় ১৫ জনকে আটক করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল বিকাল ৪টা থেকে নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকার বিএনপি কার্যালয় নাসিমন ভবনের সামনে জড়ো হতে থাকেন ১৮ দলের সব নেতাকর্মী। নগরীর বিভিন্ন সড়ক, মোড়, ওয়ার্ড ও থানা থেকে দল বেঁধে এই সময় মিছিল নিয়ে আসতে দেখা যায় দলীয় কর্মীদের।
বিকাল সোয়া ৪টায় জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াতের একটি মিছিল বিএনপি কার্যালয়ে ঢোকার সময় সংঘর্ষ শুরু হয়। এই সময় মিছিল থেকে কে বা কারা পুলিশকে লক্ষ্য করে কথা বললে ঘটনার সূত্রপাত হয়। এক পর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরে তা ছড়িয়ে যায় কাজীর দেউড়ির বিভিন্ন এলাকায়।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সবাইকে ছত্রভঙ্গ করে দেন। একটি পক্ষ কাজীর দেউড়ির উত্তর পাশে, কিছু নেতাকর্মী দলীয় কার্যালয়ের ভেতর ও বাকিরা লাভ লেন, এনায়েত বাজারের দিকে চলে যায়।
পরে সবাই আবার জমায়েত হওয়ার চেষ্টা করে। এই সময় পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে থাকে। জোটের নেতাকর্মীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে পাল্টা ইটপাটকেল ছোড়ে। এতে আশপাশের আবাসিক এলাকা ও লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন ছুটোছুটি করতে থাকে। ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দেন। সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে ওয়াসা, লালখানের মোড়ে। সংঘর্ষের মাঝখানে পড়ে জোটের কর্মীদের ছোড়া ইটের আঘাতে চট্টগ্রামের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোকচিত্র সাংবাদিক সুমন বাবু, বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোকচিত্র সাংবাদিক উজ্জ্বল ধর, যায়যায়দিনের ফটোসাংবাদিক মশিউর রেহমান বাদল গুরুতরভাবে আহত হন। সংঘর্ষের সময় জোটের একদল নেতাকর্মী ৪ পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ সদস্যরা জোট নেতাকর্মীদের ধরতে ধাওয়া করলে লাভ লেনের কাছে কয়েকজন পড়ে যায়। পরে তাদের ধরে বেধড়ক পিটুনি দেয়া হয়।
পুলিশি বাধায় কর্মসূচি পণ্ড হয়ে গেলে জোট কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা এই সময় কাজীর দেউড়ি এলাকায় একটি প্রাইভেটকারে আগুন ধরিয়ে দেয়। একই ভাবে গাড়িতে আগুন দেয়া হয় নগরীর বিভিন্ন স্থানে। জোট কর্মীরা সংঘর্ষের সময় ৩টি রিকশা ও একটি সিএনজি ভাঙচুর করে। প্রায় দেড় ঘণ্টা সংঘর্ষ চলার পর সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
নগরীর কোতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) সজীব কুমার দাস বলেন, মিছিলকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে কটূক্তি করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় কয়েকজন কর্মী গায়ের ওপর এসে পড়লে পুলিশ নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করে। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের অনেকের মাথা ফেটে গেছে। হামলা চালানোর অভিযোগে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
এদিকে বিএনপি নেতারা সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, পুলিশ অন্যায়ভাবে তাদের পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচিতে হামলা চালিয়েছে। দেশব্যাপী হত্যা-খুনের প্রতিবাদে ও নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর সন্ধান দাবিতে গতকাল তারা এই কর্মসূচির আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ অহেতুক তাদের ওপর হামলা করে নেতাকর্মীদের আহত করেছে।
পুলিশের বেধড়ক পিটুনিতে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন নগর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন, উত্তর জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আসলাম চৌধুরী, কেন্দ্রীয় শিশু বিষয়ক সম্পাদিকা রোজী কবীর, চট্টগ্রাম হাটহাজারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ আলমসহ ৮০ থেকে ৯০ জন।
ঘটনার পরপরই গতকাল সন্ধ্যায় নগর সভাপতির বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি’র নেতাকর্মীরা। আজ সোমবার তারা প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবেন নগরীতে।
এব্যাপারে জানতে চাইলে নগর বিএনপি’র সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এই ঘটনাই বলে দেয় সরকারের ভিত কতটুকু দুর্বল। তারা পুলিশ দিয়ে রাজপথ ধরে রাখতে চায়। তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনীর লাঠির আঘাতে আমাদের অন্তত ১০০ কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের নগরীর বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। সরকার পতনে আমাদের আন্দোলন চলবে।
নগর বিএনপির সংবাদ সম্মেলন
এদিকে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন চট্টগ্রাম বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তারা এ ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করে পুলিশি আচরণের তীব্র নিন্দা জানান। একই সঙ্গে আজ বিকাল ৩টায় নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল করার ঘোষণা দেন। নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাসায় এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। তিনি জানান, সরকার অগণতান্ত্রিকভাবে আমাদের ওপর এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনী নিরীহ কর্মীদের যেভাবে পেটালো তা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে।
ইলিয়াস আলীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সরকারের অধীনে কেউ নিরাপদ নন। প্রতিদিনই কেবল গুম আর হত্যার ঘটনা ঘটছে। সরকার নিজেদের অবস্থান দুর্বল দেখে বিরোধী দলের ওপর পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে। তাদের মামলা দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করছে।‘ পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক দেশে কেউ কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে গেলে তাকে এভাবে হয়রানি হতে হওয়ার বিষয়টি লজ্জার, ধিক্কারের, যা এই সরকারের আমলে হচ্ছে।‘
নেতা-কর্মীদের আহত হওয়ার বিষয়ে খসরু বলেন, ‘আজকের ঘটনায় আমাদের অন্তত ১০০ থেকে দেড়শ’ কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের কারও মাথা ফেটে গেছে। কারও হাতে গুরুতর আঘাত লেগেছে।
পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমাদের কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল নিয়ে নাসিমন ভবনের দিকে আসছিল। কিন্তু পুলিশ বাহিনী পরিকল্পিতভাবে তা ভণ্ডুল করতে এমন ঘটনার জন্ম দিয়েছে।‘
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আকবর খোন্দকার, নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাৎ হোসেনসহ অন্তত ২৫ জন নেতা।
সন্ধ্যার পর পুলিশের তল্লাশি: এদিকে সন্ধ্যার পর নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সন্দেহে অভিযান চালায় নগর পুলিশ। এ সময় চকবাজার, মুরাদপুর, আন্দরকিল্লা, বহদ্দারহাট, ওয়াসা, লালখান বাজারের আশপাশে প্রচুর পুলিশ সদস্যকে টহল দিতে দেখা যায়। ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে জিইসি মোড়ে সন্ধ্যার দিকে একটি মিছিল বের করলে পুলিশ এসে সবাইকে ধাওয়া করে।
নগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন দীপ্তি বলেন, ‘পুলিশ ছাত্রদলের কর্মীদের খুঁজে বের করতে তাদের বাড়িতে ও বাসায় হানা দিচ্ছে। গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে অনেকে তাই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন’। একই রকম অভিমত ব্যক্ত করে
নগর মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আঁখি সুলতানা বলেন, ‘যেভাবে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। এভাবে কেউ কাউকে পেটায় না’।
মামলা দায়েরের প্রস্তুতি: ঘটনার সঙ্গে জড়িত ও পুলিশের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগে নগরীর কোতোয়ালি থানায় বিএনপি ও জোটের আড়াইশ’ নেতা-কর্মীকে অভিযুক্ত করে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানিয়েছে। এতে বিএনপিসহ জামায়াতের অনেক শীর্ষ নেতা থাকতে পারেন বলে মানবজমিনকে জানিয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার এসএম তানভীর আরাফাত।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পুলিশ বাদী হয়ে রাত ১০টার মধ্যে একটি মামলা করবে। ঘটনার সময় আমাদের নগর পুলিশের কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, কোতোয়ালি থানার ওসি রফিকুল ইসলাম, ওসি (তদন্ত) সদ্বীপ কুমার দাশ, এস আই মো. হারুন, এসআই আজগরসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। যারা পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মামলার এজাহারে বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে’।
গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক: এদিকে সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে নগরীর কাজীর দেওড়ি এলাকায় গাড়ি চলাচল শুরু হয়। নগরীর নিউমার্কেট মোড়, ওয়াসা, আগ্রাবাদ এলাকায়ও লোকজনের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করে। সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন স্থানে যানজটে পড়ে মারাত্মক দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন কর্মজীবী লোকজনরা।সূত্র- এমজমিন।
Add Your Comment
- চট্টগ্রামে হরতাল চলছে, আটক ১৫
- জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দর!
- এলডিপি কার্যালয়ে পুলিশি অভিযান
- পুলিশ ও বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ চট্টগ্রাম রণক্ষেত্র
- ১১ দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই চট্টগ্রামের ধনিয়ালা পাড়ায়
- পটিয়ায় সন্ত্রাসী কুখ্যাত ডাকাত ইকবাল বাহীনির প্রধান ইকবাইল্যা গ্রেফতার
- পটিয়ায় সড়ক দূর্ঘটনায় একজন নিহত
- চট্টগ্রামে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত ১
- ধামইরহাটে স্কুলছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার



















